বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন
রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি॥
শীতের সকালের ঘন কুয়াশা ভেদ করে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে এখন শুধুই হলুদের উচ্ছ্বাস। গ্রামবাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তর সরিষার ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে উঠেছে। বাতাসে ভাসছে মৌ মৌ গন্ধ, আর সেই সুবাসে কৃষকের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে আগামীর স্বপ্ন ও স্বস্তির ঝিলিক। অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত বীজের ব্যবহার এবং কৃষি অফিসের নিবিড় তদারকিতে চলতি মৌসুমে উপজেলায় সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
আবাদ ও লক্ষ্যমাত্রা:
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে রাণীশংকৈলে মোট ৭ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭০০ হেক্টর বেশি। উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় এবার রেকর্ড পরিমাণ জমিতে তেলের এই ফসলের চাষ হয়েছে।
মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌচাষিরা:
সরিষা চাষকে কেন্দ্র করে রাণীশংকৈলে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। হলুদের সমারোহে শুধু কৃষকরাই নন, ব্যস্ততা বেড়েছে মৌচাষিদেরও। উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের কাদিহাট মালিবস্তি এলাকায় শতাধিক মৌ-বক্স নিয়ে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত দিনাজপুরের বীরগঞ্জ থেকে আসা মৌচাষি আব্দুস সাত্তার। তিনি জানান, ১৫-২০ দিনের অবস্থানে এখান থেকে প্রায় ১৫-২০ মণ মধু সংগ্রহের আশা করছেন তিনি। উৎপাদিত এই খাঁটি মধু স্থানীয় বাজারে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

কৃষকদের প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা:
স্থানীয় কৃষক মঞ্জুর আলম ও সোহেল রানা বলেন, “সরিষা চাষে আমরা যেমন ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে পারছি, তেমনি মৌচাষিদের কল্যাণে ঘরের কাছেই খাঁটি মধু পাচ্ছি।” পাটাগড়া গ্রামের কৃষক বাবুল হোসেন জানান, দুই বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করতে বিঘাপ্রতি প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ভালো হলে বিঘাপ্রতি ১৫ হাজার টাকার সরিষা বিক্রির আশা করছেন তিনি।
তবে কৃষকদের দাবি, বাজার ব্যবস্থাপনা ও নায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে তেল উৎপাদন ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে সরিষা চাষ আরও লাভজনক হয়ে উঠবে।
উন্নত জাতের বিপ্লব:
এ বছর কৃষকরা বারি সরিষা-৭, ৮, ১৪, ১৮, ২০; বিনা সরিষা-৪, ৯, ১০, ১১ এবং বাউ সরিষা-৪ থেকে ৮ জাতের আবাদ করেছেন। এসব উচ্চ ফলনশীল ও স্বল্প জীবনকালীন জাতগুলো প্রচলিত জাতের তুলনায় অধিক পুষ্টিগুণসম্পন্ন ও লাভজনক।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, “অল্প সময় ও স্বল্প খরচে সরিষা একটি লাভজনক ফসল। আমন ও বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে পতিত জমি সরিষা চাষে ব্যবহৃত হওয়ায় এটি কৃষকদের বাড়তি আয় নিশ্চিত করছে। মাঠের অবস্থা দেখে এবার বাম্পার উৎপাদনের আশা করছি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা বেগম জানান, কৃষি অফিসের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এ বছর সরিষার আবাদ ব্যাপক হয়েছে। কৃষকদের উৎসাহিত করতে সরকারি কৃষি সহায়তা ও প্রণোদনা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।